ad720-90

কল্পনা থেকে জীবন্ত বিশ্ব !


কল্পনা থেকে জীবন্ত বিশ্ব !

আজ ২৮ অক্টোবর (বুধবার), আন্তর্জাতিক অ্যানিমেশন দিবস। অ্যানিমেশনশিল্পী, প্রযুক্তিবিদ ও নির্মাতাদের অবদান স্মরণ এবং শিল্পটির বহুমাত্রিক গুরুত্ব তুলে ধরতে প্রতি বছর এদিন দিবসটি পালিত হয়।

এটি শুধু কার্টুন বা বিনোদনের উপলক্ষ নয়; বরং মানুষের কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও দৃশ্যশিল্পের বিকাশকে উদ্‌যাপনের দিন। স্থির ছবিকে ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে গতির বিভ্রম সৃষ্টির এ শিল্প আজ চলচ্চিত্র, শিক্ষা, বিজ্ঞাপন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, স্থাপত্য ও ভিডিও গেমসহ নানা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

দিবসটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৮৯২ সালের ২৮ অক্টোবর ফ্রান্সের প্যারিসের গ্রেভাঁ জাদুঘরে উদ্ভাবক চার্লস-এমিল রেনো তাঁর উদ্ভাবিত ‘থিয়েট্র অপটিক’ যন্ত্রের সাহায্যে জনসমক্ষে অ্যানিমেশন প্রদর্শন করেন। ‘পান্তোমিম লুমিনিউজ’ নামের এ প্রদর্শনীতে তিনটি অ্যানিমেটেড কাহিনি দেখানো হয়। ১৮৮৮ সালে পেটেন্ট নেয়া যন্ত্রটির সাহায্যে হাতে আঁকা ছবির দীর্ঘ ফিতা প্রজেক্টরের মাধ্যমে পর্দায় প্রদর্শন করা হতো। রেনোর এ উদ্যোগ চলমান ছবি প্রদর্শনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।

২০০২ সালে আন্তর্জাতিক অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র সমিতি—এএসআইএফএ—২৮ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক অ্যানিমেশন দিবস হিসেবে উদ্‌যাপনের উদ্যোগ নেয়। পরবর্তী সময়ে আলোকচিত্রভিত্তিক চলচ্চিত্র জনপ্রিয় হয়ে উঠলে রেনোর প্রদর্শনীর প্রতি দর্শকের আগ্রহ কমে যায়। আর্থিক সংকটে পড়ে ১৯১৩ সালে তিনি তার শেষ ‘থিয়েট্র অপটিক’ যন্ত্রটি ভেঙে ফেলেন এবং অধিকাংশ চলচ্চিত্র ধ্বংস করে দেন। তার জীবনের এ অধ্যায় শিল্পের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং উদ্ভাবকদের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়নের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।

অ্যানিমেশনের ধারণা অবশ্য আধুনিক চলচ্চিত্রেরও বহু আগের। প্রাচীন গুহাচিত্রে প্রাণীর বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি এঁকে গতির ধারণা প্রকাশের চেষ্টা দেখা যায়। উনিশ শতকে ফেনাকিস্টিস্কোপ ও জোইট্রোপের মতো যন্ত্র স্থির ছবির মাধ্যমে গতির বিভ্রম তৈরির পথ দেখায়। পরে ১৯০৬ সালে জে. স্টুয়ার্ট ব্ল্যাকটনের ‘হিউমারাস ফেজেস অব ফানি ফেসেস’ এবং ১৯১৪ সালে উইনসর ম্যাককের ‘গার্টি দ্য ডাইনোসর’ অ্যানিমেশনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

বিশ শতকে ওয়াল্ট ডিজনি অ্যানিমেশনকে জনপ্রিয় বিনোদনের মূল ধারায় প্রতিষ্ঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯২৮ সালের ‘স্টিমবোট উইলি’ সমন্বিত শব্দ ব্যবহারের জন্য পরিচিতি পায় এবং মিকি মাউস চরিত্রকে জনপ্রিয় করে তোলে। ১৯৩৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘স্নো হোয়াইট অ্যান্ড দ্য সেভেন ডোয়ার্ফস’ পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রের সম্ভাবনাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। পরে কম্পিউটার প্রযুক্তির বিকাশ এ শিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। ১৯৯৫ সালে পিক্সারের ‘টয় স্টোরি’ প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কম্পিউটার-অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেয়। অন্যদিকে, জাপানি অ্যানিমে, বিশেষ করে হায়াও মিয়াজাকির ‘স্পিরিটেড অ্যাওয়ে’, কল্পনা, সংস্কৃতি ও মানবিক অনুভূতির সমন্বয়ে বিশ্বজুড়ে দর্শকের মন জয় করেছে।

আরও পড়ুন<<>>আজ বিশ্ব ব্যর্থতা দিবস

বর্তমানে অ্যানিমেশনের প্রধান ধরনগুলোর মধ্যে রয়েছে দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক অ্যানিমেশন, স্টপ-মোশন এবং মোশন গ্রাফিক্স। ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি ও দৃশ্যগত প্রভাব তৈরির প্রযুক্তিও এর ব্যবহার বাড়িয়েছে। অ্যানিমেশন এখন আর শিশুদের কার্টুনে সীমাবদ্ধ নয়; জটিল বৈজ্ঞানিক বিষয় ব্যাখ্যা, স্বাস্থ্যশিক্ষা, চিকিৎসা প্রশিক্ষণ, স্থাপত্যের নকশা, বিজ্ঞাপন ও ডিজিটাল যোগাযোগেও এটি কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

আন্তর্জাতিক অ্যানিমেশন দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন দেশে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, কর্মশালা, সেমিনার ও শিল্পকর্ম প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়। এসব উদ্যোগ শিল্পীদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং নতুন প্রজন্মকে সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করে।

তবে বর্তমান অ্যানিমেশনশিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। এআইয়ের সাহায্যে ধারণাচিত্র তৈরি, পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ সহজ করা এবং প্রাথমিক দৃশ্য পরিকল্পনা দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। এতে নবীন ও স্বল্প বাজেটের নির্মাতারা উপকৃত হতে পারেন।

অন্যদিকে, কর্মসংস্থান, শিল্পীর ন্যায্য পারিশ্রমিক, মেধাস্বত্ব এবং অনুমতি ছাড়া শিল্পকর্ম ব্যবহারের নৈতিকতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাই এআইকে মানুষের সৃজনশীলতার বিকল্প না বানিয়ে সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার এবং শিল্পীদের অধিকার সুরক্ষিত রাখা জরুরি। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানবিক অনুভূতি, সাংস্কৃতিক উপলব্ধি ও স্বতন্ত্র গল্প বলার ক্ষমতাই অ্যানিমেশনকে গভীরতা দেয়।

বাংলাদেশেও অ্যানিমেশনশিল্প বিকাশের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এ জন্য তরুণদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অ্যানিমেশন শিক্ষা, দেশীয় শিল্পীদের কাজ প্রদর্শনের সুযোগ এবং স্থানীয় গল্প ও ইতিহাসভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণে উৎসাহ দেয়া প্রয়োজন। বাংলা ভাষা, লোকসংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে মানসম্মত অ্যানিমেশন তৈরি করা গেলে দেশের সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে তুলে ধরার নতুন পথ তৈরি হবে। পাশাপাশি মেধাস্বত্ব সম্পর্কে সচেতনতা, ন্যায্য পারিশ্রমিক এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।

অ্যানিমেশন কেবল স্থির ছবিকে চলমান করার কৌশল নয়; এটি কল্পনাকে দৃশ্যমান করা, অনুভূতি প্রকাশ করা এবং সংস্কৃতির সীমানা অতিক্রম করে মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ স্থাপনের শক্তিশালী মাধ্যম। তাই আন্তর্জাতিক অ্যানিমেশন দিবস হোক শিল্পীদের স্বীকৃতি, নতুন সৃষ্টির অনুপ্রেরণা, ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহারের অঙ্গীকার। কল্পনার জগৎকে জীবন্ত করে তোলার এ শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সৃজনশীলতা, মানবিকতা ও উদ্ভাবনের সমন্বয়ের ওপর।

বাংলাদেশ সময়: ১৬:১৯:৩৯ ●
১ বার পঠিত





সর্বপ্রথম প্রকাশিত

Sharing is caring!

Comments

So empty here ... leave a comment!

Leave a Reply

Sidebar